Dhaka ০৮:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রবাসীদের দুর্দশা ও প্রতারণা

মামুনুর রশীদ মামুন
  • Update Time : ১০:০৯:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
  • / ১৪৬ Time View

দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসী রেমিট্যান্স। আর সেই প্রবাসী কর্মীদের ঘাম ও শ্রমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় সচল চাকা দেশের অর্থনীতির। অথচ রাষ্ট্রের এই অতন্দ্র প্রহরীরাই আজ প্রতারক চক্রের কাছে জিম্মি। রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত ‘নর্থ ওয়েস্ট ওভারসীজ’ (আরএল-২৬৯২) নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে ভিসা জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভিযোগ রয়েছে, এই এজেন্সির খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে সৌদি আরব প্রবাসী অসংখ্য শ্রমিক। বিএমইটি (জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো) ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ভুক্তভোগীদের পাহাড়সম অভিযোগ থাকলেও প্রতিকার মিলছে না, বরং সরকারি নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে পার পেয়ে যাচ্ছে অভিযুক্তরা।

​প্রতারণার অভিনব কৌশল ও অমানবিক বাস্তব: ​ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নর্থ ওয়েস্ট ওভারসীজ মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে প্রবাসে পাঠিয়ে তাদের কর্মসংস্থান বা বৈধ কাগজপত্র দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। এতে প্রবাসীরা সৌদি আরবে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ‘অবৈধ’ হিসেবে জীবনযাপন করছেন। যেকোনো সময় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে দেশে ফিরতে হতে পারে—এই আতঙ্কে প্রবাসীরা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, নর্থ ওয়েস্ট ওভারসীজ, মানিকগঞ্জ ওভারসীজ (আরএল-১৪৯৭) এবং নয়ন ওভারসীজ (আরএল-১৮৬৬)-এর সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী চক্র প্রবাসীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

​সরকারি নির্দেশনার অবজ্ঞা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা:​ভুক্তভোগীরা আইন মেনে বিএমইটি ভবন ও জেলা কর্মসংস্থান অফিসে অভিযোগ দায়ের করেছেন। বেশ কিছু ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তারা তদন্ত শেষে ক্ষতিপূরণ ধার্য করলেও, সেই নির্দেশনার কোনো তোয়াক্কা করছে না অভিযুক্ত নর্থ ওয়েস্ট ওভারসীজ। নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ এবং টালবাহানা করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জেলা অফিস থেকে ভুক্তভোগীদের আর ডাকা হচ্ছে না, যা সরকারি কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলছে।

​দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে এজেন্সি:​এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নর্থ ওয়েস্ট ওভারসীজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম সরাসরি দায় স্বীকার করে বলেন, “আমরা অন্য এজেন্সি থেকে ভিসা কিনেছিলাম। ভুক্তভোগীদের অভিযোগের সত্যতা আছে এবং আমরা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চেষ্টা করছি।” তবে অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, দীর্ঘ সময় পার হলেও ক্ষতিপূরণের কোনো প্রতিফলন নেই। অন্যদিকে, জেলা কর্মসংস্থান অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এজেন্সি ক্ষতিপূরণ না দেওয়ায় তারা এখন বিষয়টি বিএমইটি সদর দপ্তরে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অর্থাৎ, বিচারের নামে চলছে কেবলই ফাইল চালাচালি।

​প্রশ্নবিদ্ধ নাগরিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা: ​রাষ্ট্র কি তার বৈধ নাগরিক ও রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে? সরকারি দপ্তরে অভিযোগ করেও বিচার না পাওয়া এবং অপরাধী এজেন্সির ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ নতুন করে প্রবাসীদের আস্থাহীনতার জন্ম দিচ্ছে। সরকারের উচ্চপদস্থ নীতিনির্ধারকদের কাছে ভুক্তভোগীদের আকুল প্রশ্ন—রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করতে না পারে, তবে তারা কার কাছে যাবে? বিচারের কান্না কি এভাবেই নীরবে ফুরিয়ে যাবে? এই কেমন প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও অব্যবস্থাপনা!

​ভুক্তভোগীদের দাবি: ​সৌদি আরবে অবৈধভাবে অবস্থানকারী ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীরা এখন তাদের আইনি বৈধতা বা ‘ইকামা’ নবায়নের খরচ উক্ত রিক্রুটিং এজেন্সি থেকে আদায়ের দাবি জানিয়েছেন। তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে অবিলম্বে হস্তক্ষেপ কামনা করছেন যাতে অভিযুক্ত এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল এবং ভুক্তভোগীদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হয়।

​রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী মহলের কাছে প্রত্যাশা, এই প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যথায়, প্রবাসীদের আস্থার এই জায়গাটি ভেঙে পড়লে দেশের অর্থনীতির ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়া অনিবার্য।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

প্রবাসীদের দুর্দশা ও প্রতারণা

Update Time : ১০:০৯:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬

দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসী রেমিট্যান্স। আর সেই প্রবাসী কর্মীদের ঘাম ও শ্রমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় সচল চাকা দেশের অর্থনীতির। অথচ রাষ্ট্রের এই অতন্দ্র প্রহরীরাই আজ প্রতারক চক্রের কাছে জিম্মি। রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত ‘নর্থ ওয়েস্ট ওভারসীজ’ (আরএল-২৬৯২) নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে ভিসা জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভিযোগ রয়েছে, এই এজেন্সির খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে সৌদি আরব প্রবাসী অসংখ্য শ্রমিক। বিএমইটি (জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো) ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ভুক্তভোগীদের পাহাড়সম অভিযোগ থাকলেও প্রতিকার মিলছে না, বরং সরকারি নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে পার পেয়ে যাচ্ছে অভিযুক্তরা।

​প্রতারণার অভিনব কৌশল ও অমানবিক বাস্তব: ​ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নর্থ ওয়েস্ট ওভারসীজ মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে প্রবাসে পাঠিয়ে তাদের কর্মসংস্থান বা বৈধ কাগজপত্র দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। এতে প্রবাসীরা সৌদি আরবে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ‘অবৈধ’ হিসেবে জীবনযাপন করছেন। যেকোনো সময় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে দেশে ফিরতে হতে পারে—এই আতঙ্কে প্রবাসীরা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, নর্থ ওয়েস্ট ওভারসীজ, মানিকগঞ্জ ওভারসীজ (আরএল-১৪৯৭) এবং নয়ন ওভারসীজ (আরএল-১৮৬৬)-এর সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী চক্র প্রবাসীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

​সরকারি নির্দেশনার অবজ্ঞা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা:​ভুক্তভোগীরা আইন মেনে বিএমইটি ভবন ও জেলা কর্মসংস্থান অফিসে অভিযোগ দায়ের করেছেন। বেশ কিছু ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তারা তদন্ত শেষে ক্ষতিপূরণ ধার্য করলেও, সেই নির্দেশনার কোনো তোয়াক্কা করছে না অভিযুক্ত নর্থ ওয়েস্ট ওভারসীজ। নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ এবং টালবাহানা করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জেলা অফিস থেকে ভুক্তভোগীদের আর ডাকা হচ্ছে না, যা সরকারি কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলছে।

​দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে এজেন্সি:​এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নর্থ ওয়েস্ট ওভারসীজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম সরাসরি দায় স্বীকার করে বলেন, “আমরা অন্য এজেন্সি থেকে ভিসা কিনেছিলাম। ভুক্তভোগীদের অভিযোগের সত্যতা আছে এবং আমরা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চেষ্টা করছি।” তবে অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, দীর্ঘ সময় পার হলেও ক্ষতিপূরণের কোনো প্রতিফলন নেই। অন্যদিকে, জেলা কর্মসংস্থান অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এজেন্সি ক্ষতিপূরণ না দেওয়ায় তারা এখন বিষয়টি বিএমইটি সদর দপ্তরে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অর্থাৎ, বিচারের নামে চলছে কেবলই ফাইল চালাচালি।

​প্রশ্নবিদ্ধ নাগরিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা: ​রাষ্ট্র কি তার বৈধ নাগরিক ও রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে? সরকারি দপ্তরে অভিযোগ করেও বিচার না পাওয়া এবং অপরাধী এজেন্সির ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ নতুন করে প্রবাসীদের আস্থাহীনতার জন্ম দিচ্ছে। সরকারের উচ্চপদস্থ নীতিনির্ধারকদের কাছে ভুক্তভোগীদের আকুল প্রশ্ন—রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করতে না পারে, তবে তারা কার কাছে যাবে? বিচারের কান্না কি এভাবেই নীরবে ফুরিয়ে যাবে? এই কেমন প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও অব্যবস্থাপনা!

​ভুক্তভোগীদের দাবি: ​সৌদি আরবে অবৈধভাবে অবস্থানকারী ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীরা এখন তাদের আইনি বৈধতা বা ‘ইকামা’ নবায়নের খরচ উক্ত রিক্রুটিং এজেন্সি থেকে আদায়ের দাবি জানিয়েছেন। তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে অবিলম্বে হস্তক্ষেপ কামনা করছেন যাতে অভিযুক্ত এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল এবং ভুক্তভোগীদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হয়।

​রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী মহলের কাছে প্রত্যাশা, এই প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যথায়, প্রবাসীদের আস্থার এই জায়গাটি ভেঙে পড়লে দেশের অর্থনীতির ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়া অনিবার্য।