আড়াই শ বছরের বাণিজ্যের সাক্ষী
- Update Time : ০৩:৩০:৫৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
- / ৩ Time View
অর্থনীতি ডেস্ক: খুলনার ভৈরব নদের পূর্ব আকাশে যখন সূর্য ওঠে, তখন নদীর পশ্চিম তীর জুড়ে শুরু হয় ব্যবসায়ীদের কর্মচাঞ্চল্য। ভোরবেলা ডাকবাংলোর মোড় থেকে ক্লে রোড ধরে এগোলেই চোখে পড়ে সারি সারি ফলের দোকান, যা স্থানীয়ভাবে ফলপট্টি নামে পরিচিত। এই এলাকার অলিগলিতে প্রবেশ করলেই দুই শ বছরেরও বেশি পুরনো এক বাণিজ্যকেন্দ্রের ঐতিহ্য উপলব্ধি করা যায়। সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মাছ, সবজি, মাংস ও মসলার আড়তগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় জমে ওঠে। দিনভর নানা পণ্যের পসরা সাজানো এই বাজার রাত পর্যন্ত মুখর থাকে এবং উৎসবের দিনে তা গভীর রাত পর্যন্ত চলে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের পটভূমিতে গড়ে ওঠা এই বাজারটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৭৮৬ সালে ব্রিটিশ নীলকর চার্লি সাহেব ভৈরব নদের তীরে তাঁর ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রথম দালানবাড়ি বা নীলকুঠি নির্মাণ করেন। সে সময় এই নদপথেই মূলত লবণের ব্যবসা পরিচালনা করতেন বণিকেরা। পরবর্তীতে চার্লি সাহেবের নামানুসারে এই এলাকার নাম প্রথমে চার্লিগঞ্জ এবং পরে সাহেবের হাট ও সাহেবের বাজার হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। সময়ের পরিক্রমায় ও জনসংখ্যার বৃদ্ধির ফলে এই হাটটি আজকের বৃহৎ বাণিজ্যিক রূপ লাভ করে।
উনিশ শতকের শেষভাগে খুলনা জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর এখানকার প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। ১৮৮৪ সালে স্টিমারঘাট, রেলওয়ে স্টেশন ও পৌরসভা চালুর মাধ্যমে এই এলাকাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়। কলকাতা থেকে ছেড়ে আসা ট্রেন এবং ভৈরব নদের তীরে রকেট স্টিমার ঘাটের কারণে দূরদূরান্তের মানুষ সহজেই যাতায়াত করতে পারত। এই যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে রাজস্থান, পাঞ্জাব, বিহার ও ওডিশা থেকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বণিকেরা এখানে এসে ব্যবসা ও বসতি স্থাপন করেন। মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের তৈরি শতবর্ষী দালানকোঠাগুলো আজও এই অঞ্চলের প্রাচীন স্থাপত্যশিল্প ও সমৃদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে।
ঐতিহ্যগতভাবে নদপথই ছিল এই বাজারের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম, যার ফলে ভৈরব নদের তীরে নিমতলা ঘাট, ডেল্টা ঘাট, রকেট ঘাটসহ বিভিন্ন নামের বেশ কয়েকটি ঘাট গড়ে ওঠে। অতীতে এসব ঘাটে নৌকা ও স্টিমারে করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পণ্য আনা হলেও বর্তমানে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে ট্রাকে করে পণ্য পরিবহন বেশি হয়ে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজারের পরিসর বৃদ্ধি পেয়ে ওয়েস্ট মেকট রোড, কালীবাড়ি রোড ও ক্লে রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এই বাজারে বর্তমানে পাঁচ হাজারের বেশি স্থায়ী ও অস্থায়ী দোকান রয়েছে।
যদিও পরবর্তীতে এই অঞ্চলে আরও অনেক নতুন বাজার গড়ে ওঠায় বড় বাজারের আগের সেই নিরঙ্কুশ আধিক্য কিছুটা কমেছে, তথাপি এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ঐতিহ্য একটুও ম্লান হয়নি। কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্রটি আজও দক্ষিণ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে টিকে আছে। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও বড় বাজারের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে শত শত বছরের পুরোনো ব্যবসা ও সংস্কৃতির অমলিন স্মৃতি।
























