Dhaka ১০:৩১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সরকারের নিট ব্যাংকঋণ: ব্যয় মেটাতে ব্যাংকমুখী সরকার

Reporter Name
  • Update Time : ০৮:১৫:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
  • / ৬ Time View

অর্থনীতি ডেস্ক: দেশের রাজস্ব আয় এবং সরকারি ব্যয়ের মধ্যকার ব্যবধান দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই পরিস্থিতিতে রাজস্ব সংগ্রহের ঘাটতি কাটিয়ে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই অর্থাৎ জুলাই থেকে অক্টোবর সময়কালে ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ নিট ঋণ নিয়েছে সরকার। এই চার মাসে সরকারের নেওয়া নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় আটচল্লিশ হাজার কোটি টাকা। এর মাধ্যমে পুরো অর্থবছরের জন্য ব্যাংকঋণ নেওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তার প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি ইতিমধ্যেই অর্জিত হয়ে গেছে। সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী বর্ধিত বেতন-ভাতা পরিশোধের আর্থিক চাপও এই ঋণ বৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শুধু অক্টোবর মাসেই ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করেছে সরকার। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে জুলাই মাসে ছাপ্পান্ন হাজার কোটি, আগস্টে পঞ্চাশ হাজার কোটি এবং সেপ্টেম্বরে সাড়ে একচল্লিশ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল। তবে অক্টোবর মাসে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে এই ঋণের পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। অবশ্য এই হিসাবটি হলো মোট ঋণের পরিসংখ্যান, যার একটি বড় অংশ আগের নেওয়া ঋণের মেয়াদ শেষ হওয়ায় তা পরিশোধ কিংবা পুরোনো বিল ও বন্ড পুনঃইস্যু করার কাজে ব্যয় হয়। এই সমস্ত দেনা পাওনা এবং হিসাব সমন্বয় করার পরেই মূলত সরকারের নিট ঋণের সঠিক চিত্রটি প্রকাশ পায়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের আয়ের সক্ষমতা এবং প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হওয়ার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, প্রয়োজনীয় রাজস্ব আয় না পাওয়ার ফলে সরকারকে বাধ্য হয়ে ব্যাংকমুখী হতে হচ্ছে এবং নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের চাপ সামনে আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম মনে করেন, অর্থবছরের নির্দিষ্ট সময়ে সরকারের ব্যয়ের চাপ বেশি থাকে বিধায় ঋণ নিতে হয়। তবে অক্টোবর মাসে ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি পুরোনো বন্ডের অর্থ পরিশোধ করায় বাজারে টাকার সরবরাহ ও রিজার্ভ মানি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর খুব বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।

চলতি অর্থবছরের জন্য বিশাল অঙ্কের বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে যেখানে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দুই লক্ষ কোটিরও বেশি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে দেশীয় এবং বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের, যার একটি বড় অংশ মেটানোর কথা রয়েছে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত থেকে। কিন্তু এর বিপরীতে প্রথম প্রান্তিক থেকেই রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না পৌঁছানোর কারণে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের বর্ধিত বেতন-ভাতা পরিশোধের অর্থ জোগাড় করতে সম্প্রতি বিশেষ ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে আরও বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ঋণের জোগান দেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ এবং তারা সেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

সরকারের নিট ব্যাংকঋণ: ব্যয় মেটাতে ব্যাংকমুখী সরকার

Update Time : ০৮:১৫:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

অর্থনীতি ডেস্ক: দেশের রাজস্ব আয় এবং সরকারি ব্যয়ের মধ্যকার ব্যবধান দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই পরিস্থিতিতে রাজস্ব সংগ্রহের ঘাটতি কাটিয়ে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই অর্থাৎ জুলাই থেকে অক্টোবর সময়কালে ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ নিট ঋণ নিয়েছে সরকার। এই চার মাসে সরকারের নেওয়া নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় আটচল্লিশ হাজার কোটি টাকা। এর মাধ্যমে পুরো অর্থবছরের জন্য ব্যাংকঋণ নেওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তার প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি ইতিমধ্যেই অর্জিত হয়ে গেছে। সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী বর্ধিত বেতন-ভাতা পরিশোধের আর্থিক চাপও এই ঋণ বৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শুধু অক্টোবর মাসেই ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করেছে সরকার। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে জুলাই মাসে ছাপ্পান্ন হাজার কোটি, আগস্টে পঞ্চাশ হাজার কোটি এবং সেপ্টেম্বরে সাড়ে একচল্লিশ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল। তবে অক্টোবর মাসে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে এই ঋণের পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। অবশ্য এই হিসাবটি হলো মোট ঋণের পরিসংখ্যান, যার একটি বড় অংশ আগের নেওয়া ঋণের মেয়াদ শেষ হওয়ায় তা পরিশোধ কিংবা পুরোনো বিল ও বন্ড পুনঃইস্যু করার কাজে ব্যয় হয়। এই সমস্ত দেনা পাওনা এবং হিসাব সমন্বয় করার পরেই মূলত সরকারের নিট ঋণের সঠিক চিত্রটি প্রকাশ পায়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের আয়ের সক্ষমতা এবং প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হওয়ার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, প্রয়োজনীয় রাজস্ব আয় না পাওয়ার ফলে সরকারকে বাধ্য হয়ে ব্যাংকমুখী হতে হচ্ছে এবং নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের চাপ সামনে আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম মনে করেন, অর্থবছরের নির্দিষ্ট সময়ে সরকারের ব্যয়ের চাপ বেশি থাকে বিধায় ঋণ নিতে হয়। তবে অক্টোবর মাসে ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি পুরোনো বন্ডের অর্থ পরিশোধ করায় বাজারে টাকার সরবরাহ ও রিজার্ভ মানি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর খুব বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।

চলতি অর্থবছরের জন্য বিশাল অঙ্কের বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে যেখানে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দুই লক্ষ কোটিরও বেশি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে দেশীয় এবং বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের, যার একটি বড় অংশ মেটানোর কথা রয়েছে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত থেকে। কিন্তু এর বিপরীতে প্রথম প্রান্তিক থেকেই রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না পৌঁছানোর কারণে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের বর্ধিত বেতন-ভাতা পরিশোধের অর্থ জোগাড় করতে সম্প্রতি বিশেষ ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে আরও বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ঋণের জোগান দেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ এবং তারা সেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।