Dhaka ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ধারাবাহিক লোকসানে বিআইডব্লিউটিসি, পদ্মা সেতু চালুই কি একমাত্র কারণ

Reporter Name
  • Update Time : ১০:০২:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
  • / ৪ Time View

অর্থনীতি ডেস্ক: বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা বা বিআইডব্লিউটিসি টানা পাঁচ বছর ধরে বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখোমুখি হয়েছে। সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থার নিজস্ব মূল্যায়নে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু চালুর পর থেকেই মূলত তারা লাভজনক অবস্থা হারিয়ে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এর ফলে সরকারের বিপুল পরিমাণ ঋণের দায় নিয়মিত পরিশোধ করার সক্ষমতাও নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে।

১৯৭২ সালে একটি সরকারি ও নয়টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মোট ৬০৮টি নৌযান নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল এই সংস্থাটি। মূল ভূখণ্ড ও উপকূলীয় অঞ্চলের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ বজায় রাখা এবং সড়ক যোগাযোগের বিকল্প হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটে ফেরি পরিচালনা করা ছিল তাদের প্রধান দায়িত্ব। একসময় অত্যন্ত লাভজনক এই প্রতিষ্ঠানটি ২০২০-২১ অর্থবছরেও প্রায় ২১ কোটি টাকার মুনাফা অর্জন করেছিল। কিন্তু ২০২২ সালের জুন মাসে পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ফেরির ওপর নির্ভরতা দ্রুত কমতে থাকে এবং মাওয়া-কাঁঠালবাড়ী রুটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটের আয় মারাত্মকভাবে হোঁচট খায়।

প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে শুরু করে পরবর্তী পাঁচ বছরে সংস্থাটির মোট লোকসানের পরিমাণ ১৩৭ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই সময়ের মধ্যে কখনো আয় সামান্য বাড়লেও পরিচালন ব্যয় তার চেয়ে অনেক বেশি থাকায় প্রতিবছরই বড় অঙ্কের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সরকারের কাছে বর্তমানে বিআইডব্লিউটিসির ৭১৭ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে, যার বিপরীতে প্রতিবছর নিয়মিতভাবে ১৫ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু আয়ের প্রধান উৎসগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ায় এই ঋণ পরিশোধের কিস্তি মেটানোও সংস্থাটির জন্য দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যদিও পদ্মা সেতু চালুর পর আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট, তবুও লোকসানের পেছনে কেবল এটিই একমাত্র কারণ কি না, তা নিয়ে সংসদীয় কমিটির সদস্যদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। অতীতে এই প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও অতীতে আলোচিত হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে লোকসানের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং করণীয় নির্ধারণের জন্য সংসদ সদস্য হাফিজ ইব্রাহিমকে আহ্বায়ক করে একটি বিশেষ উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে এই কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে বলে জানা গেছে।

এদিকে লোকসানের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বিআইডব্লিউটিসি নতুন নৌরুট চালুর পাশাপাশি বিভিন্ন বিকল্প উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে ভোলার ইলিশা পর্যন্ত নতুন ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়েছে এবং আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে আরও ১৫টি নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু যাত্রীবাহী নৌযানকে ভাসমান হাসপাতাল ও রেস্তোরাঁ হিসেবে রূপান্তর করা হয়েছে। সংসদীয় কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন এবং নতুন এসব উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করছে এই ঐতিহ্যবাহী সরকারি সংস্থার ভবিষ্যৎ গতিপথ।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

ধারাবাহিক লোকসানে বিআইডব্লিউটিসি, পদ্মা সেতু চালুই কি একমাত্র কারণ

Update Time : ১০:০২:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

অর্থনীতি ডেস্ক: বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা বা বিআইডব্লিউটিসি টানা পাঁচ বছর ধরে বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখোমুখি হয়েছে। সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থার নিজস্ব মূল্যায়নে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু চালুর পর থেকেই মূলত তারা লাভজনক অবস্থা হারিয়ে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এর ফলে সরকারের বিপুল পরিমাণ ঋণের দায় নিয়মিত পরিশোধ করার সক্ষমতাও নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে।

১৯৭২ সালে একটি সরকারি ও নয়টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মোট ৬০৮টি নৌযান নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল এই সংস্থাটি। মূল ভূখণ্ড ও উপকূলীয় অঞ্চলের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ বজায় রাখা এবং সড়ক যোগাযোগের বিকল্প হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটে ফেরি পরিচালনা করা ছিল তাদের প্রধান দায়িত্ব। একসময় অত্যন্ত লাভজনক এই প্রতিষ্ঠানটি ২০২০-২১ অর্থবছরেও প্রায় ২১ কোটি টাকার মুনাফা অর্জন করেছিল। কিন্তু ২০২২ সালের জুন মাসে পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ফেরির ওপর নির্ভরতা দ্রুত কমতে থাকে এবং মাওয়া-কাঁঠালবাড়ী রুটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটের আয় মারাত্মকভাবে হোঁচট খায়।

প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে শুরু করে পরবর্তী পাঁচ বছরে সংস্থাটির মোট লোকসানের পরিমাণ ১৩৭ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই সময়ের মধ্যে কখনো আয় সামান্য বাড়লেও পরিচালন ব্যয় তার চেয়ে অনেক বেশি থাকায় প্রতিবছরই বড় অঙ্কের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সরকারের কাছে বর্তমানে বিআইডব্লিউটিসির ৭১৭ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে, যার বিপরীতে প্রতিবছর নিয়মিতভাবে ১৫ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু আয়ের প্রধান উৎসগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ায় এই ঋণ পরিশোধের কিস্তি মেটানোও সংস্থাটির জন্য দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যদিও পদ্মা সেতু চালুর পর আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট, তবুও লোকসানের পেছনে কেবল এটিই একমাত্র কারণ কি না, তা নিয়ে সংসদীয় কমিটির সদস্যদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। অতীতে এই প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও অতীতে আলোচিত হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে লোকসানের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং করণীয় নির্ধারণের জন্য সংসদ সদস্য হাফিজ ইব্রাহিমকে আহ্বায়ক করে একটি বিশেষ উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে এই কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে বলে জানা গেছে।

এদিকে লোকসানের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বিআইডব্লিউটিসি নতুন নৌরুট চালুর পাশাপাশি বিভিন্ন বিকল্প উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে ভোলার ইলিশা পর্যন্ত নতুন ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়েছে এবং আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে আরও ১৫টি নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু যাত্রীবাহী নৌযানকে ভাসমান হাসপাতাল ও রেস্তোরাঁ হিসেবে রূপান্তর করা হয়েছে। সংসদীয় কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন এবং নতুন এসব উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করছে এই ঐতিহ্যবাহী সরকারি সংস্থার ভবিষ্যৎ গতিপথ।