Dhaka ১০:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পান চাষে খাসিয়াদের দুর্দিন

Reporter Name
  • Update Time : ০৭:১৫:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
  • / ৪ Time View

অর্থনীতি ডেস্ক: মৌলভীবাজারের পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত খাসিয়াপুঞ্জিগুলোতে পান চাষে বর্তমানে চরম দুর্দিন চলছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাব এবং বিরূপ আবহাওয়ার কারণে চলতি মৌসুমে পান উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। শুধু উৎপাদন কমাই নয়, প্রাকৃতিক বিপত্তির কারণে পানপাতার আকারও ছোট হয়ে গেছে, যার ফলে বাজারে এর কাঙ্ক্ষিত দাম মিলছে না। অন্যদিকে কৃষি উপকরণের উচ্চমূল্য এবং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় চাষিরা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পানের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল এই জনপদের মানুষের পক্ষে এখন সংসার চালানো দুরূহ হয়ে পড়েছে। জীবিকার তাগিদে এবং চাষাবাদের খরচ মেলাতে গিয়ে সাধারণ খাসিয়া পরিবারগুলোর মাথায় ঋণের বোঝা দিন দিন ভারী হচ্ছে।

জেলাজুড়ে শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা ও রাজনগর উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় প্রায় পঁয়ষট্টিটি ছোট-বড় খাসিয়াপুঞ্জি রয়েছে। ঐতিহ্যগত ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে প্রাকৃতিকভাবে টিলার ছায়াঘেরা বনাঞ্চলে খাসিয়ারা পান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। পুরুষেরা জুম বা বরজে গিয়ে গাছের পরিচর্যা ও পাতা সংগ্রহের কাজ করেন এবং নারীরা দলবদ্ধভাবে নিপুণ হাতে পান সাজিয়ে বাজারজাতকরণের উপযুক্ত করে তোলেন। সাধারণত বর্ষাকাল পান উৎপাদনের ভরা মৌসুম হলেও সাম্প্রতিক সময়ে প্রকৃতির খামখেয়ালিপনায় সেই চিরচেনা চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পানের ফলন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আগে যেখানে দেড় মাস পরপর গাছ থেকে পরিপক্ব পান সংগ্রহ করা যেত, এখন তার জন্য দুই থেকে আড়াই মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

বাজারে ছোট আকৃতির পানের কদর কম থাকায় এবং পাতার রং কিছুটা মলিন হয়ে যাওয়ায় বড় ব্যবসায়ীরা এগুলো বিদেশে রপ্তানি করতে পারছেন না। এর ফলে গত জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় অত্যন্ত কম দামে পান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন চাষিরা। সাধারণত ভরা মৌসুমে প্রতি সপ্তাহে যেখানে দশ থেকে বারো হাজার টাকার পান বিক্রি হতো, সেখানে বর্তমানে তা কমে পাঁচ থেকে ছয় হাজারে নেমে এসেছে। নাহার পুঞ্জির বাসিন্দা ডিবারমিন পতাম জানান যে শীতের আগমনে পানের মৌসুম প্রায় শেষের পথে এবং অনেক জুমে এখন পান প্রায় নেই বললেই চলে। লাউয়াছড়া পুঞ্জির হেডম্যান ফিলা পতমী ও মাধবপুর ইউনিয়নের হীরামতিছড়ার হেডম্যান বিওয়ানলী সুঙ উভয়েই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে পোকাড়ামাকড় ও নানা রোগবালাই মোকাবিলা করে উৎপাদিত পানের কোনো ন্যায্যমূল্য তারা পাচ্ছেন না। নিত্যপণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির বাজারে আয়ের একমাত্র এই উৎসের মূল্য কমে যাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে তাদের তীব্র আর্থিক অনটনে দিন কাটাতে হচ্ছে।

খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের প্রচার সম্পাদক সাজু মারছিয়াং উল্লেখ করেন যে খাসিয়াদের অর্থনীতি সম্পূর্ণ পানকেন্দ্রিক হওয়ায় ফলন বিপর্যয় ও উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় তরুণ প্রজন্মসহ সবাই ভীষণ হতাশ। শত বছরের বাপ-দাদার এই ঐতিহ্য ও জীবিকা বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং সঠিক বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি। এদিকে মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন জানিয়েছেন যে চাষিদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কৃষি বিভাগ থেকে নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে। পান চাষে নতুন কোনো জটিলতা দেখা দিলে তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

পান চাষে খাসিয়াদের দুর্দিন

Update Time : ০৭:১৫:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

অর্থনীতি ডেস্ক: মৌলভীবাজারের পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত খাসিয়াপুঞ্জিগুলোতে পান চাষে বর্তমানে চরম দুর্দিন চলছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাব এবং বিরূপ আবহাওয়ার কারণে চলতি মৌসুমে পান উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। শুধু উৎপাদন কমাই নয়, প্রাকৃতিক বিপত্তির কারণে পানপাতার আকারও ছোট হয়ে গেছে, যার ফলে বাজারে এর কাঙ্ক্ষিত দাম মিলছে না। অন্যদিকে কৃষি উপকরণের উচ্চমূল্য এবং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় চাষিরা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পানের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল এই জনপদের মানুষের পক্ষে এখন সংসার চালানো দুরূহ হয়ে পড়েছে। জীবিকার তাগিদে এবং চাষাবাদের খরচ মেলাতে গিয়ে সাধারণ খাসিয়া পরিবারগুলোর মাথায় ঋণের বোঝা দিন দিন ভারী হচ্ছে।

জেলাজুড়ে শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা ও রাজনগর উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় প্রায় পঁয়ষট্টিটি ছোট-বড় খাসিয়াপুঞ্জি রয়েছে। ঐতিহ্যগত ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে প্রাকৃতিকভাবে টিলার ছায়াঘেরা বনাঞ্চলে খাসিয়ারা পান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। পুরুষেরা জুম বা বরজে গিয়ে গাছের পরিচর্যা ও পাতা সংগ্রহের কাজ করেন এবং নারীরা দলবদ্ধভাবে নিপুণ হাতে পান সাজিয়ে বাজারজাতকরণের উপযুক্ত করে তোলেন। সাধারণত বর্ষাকাল পান উৎপাদনের ভরা মৌসুম হলেও সাম্প্রতিক সময়ে প্রকৃতির খামখেয়ালিপনায় সেই চিরচেনা চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পানের ফলন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আগে যেখানে দেড় মাস পরপর গাছ থেকে পরিপক্ব পান সংগ্রহ করা যেত, এখন তার জন্য দুই থেকে আড়াই মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

বাজারে ছোট আকৃতির পানের কদর কম থাকায় এবং পাতার রং কিছুটা মলিন হয়ে যাওয়ায় বড় ব্যবসায়ীরা এগুলো বিদেশে রপ্তানি করতে পারছেন না। এর ফলে গত জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় অত্যন্ত কম দামে পান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন চাষিরা। সাধারণত ভরা মৌসুমে প্রতি সপ্তাহে যেখানে দশ থেকে বারো হাজার টাকার পান বিক্রি হতো, সেখানে বর্তমানে তা কমে পাঁচ থেকে ছয় হাজারে নেমে এসেছে। নাহার পুঞ্জির বাসিন্দা ডিবারমিন পতাম জানান যে শীতের আগমনে পানের মৌসুম প্রায় শেষের পথে এবং অনেক জুমে এখন পান প্রায় নেই বললেই চলে। লাউয়াছড়া পুঞ্জির হেডম্যান ফিলা পতমী ও মাধবপুর ইউনিয়নের হীরামতিছড়ার হেডম্যান বিওয়ানলী সুঙ উভয়েই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে পোকাড়ামাকড় ও নানা রোগবালাই মোকাবিলা করে উৎপাদিত পানের কোনো ন্যায্যমূল্য তারা পাচ্ছেন না। নিত্যপণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির বাজারে আয়ের একমাত্র এই উৎসের মূল্য কমে যাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে তাদের তীব্র আর্থিক অনটনে দিন কাটাতে হচ্ছে।

খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের প্রচার সম্পাদক সাজু মারছিয়াং উল্লেখ করেন যে খাসিয়াদের অর্থনীতি সম্পূর্ণ পানকেন্দ্রিক হওয়ায় ফলন বিপর্যয় ও উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় তরুণ প্রজন্মসহ সবাই ভীষণ হতাশ। শত বছরের বাপ-দাদার এই ঐতিহ্য ও জীবিকা বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং সঠিক বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি। এদিকে মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন জানিয়েছেন যে চাষিদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কৃষি বিভাগ থেকে নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে। পান চাষে নতুন কোনো জটিলতা দেখা দিলে তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।