Dhaka ০৫:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুই হাত নেই, পা দিয়ে লিখে এসএসসি-এইচএসসিতে জিপিএ-৫

Reporter Name
  • Update Time : ০২:৩০:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
  • / ৩ Time View

জাতীয় ডেস্ক: শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের তরুণ মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম রাব্বি। দুর্ঘটনার কবলে পড়ে শৈশবে দুই হাত হারালেও শিক্ষার আলো থেকে দূরে সরে যাননি এই মেধাবী শিক্ষার্থী। প্রথমে মুখে এবং পরবর্তীতে পায়ের আঙুলের ফাঁকে কলম গুঁজে লেখার অভ্যাস গড়ে তোলেন তিনি। এই দীর্ঘ ও কঠিন সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়েই বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক—উভয় পরীক্ষাতেই জিপিএ-৫ অর্জনের গৌরব অর্জন করেছেন রাব্বি। তার এই অসামান্য সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও শিক্ষানুরাগীরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বড় ধরনের বিপদের মুখে পড়ে রাব্বি। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ভাটিয়ারী এলাকার একটি ফুটওভারব্রিজে চলন্ত অবস্থায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হয় সে। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসার পর তার জীবন বাঁচানো সম্ভব হলেও কনুই পর্যন্ত দুটি হাতই কেটে ফেলতে হয় চিকিৎসকদের। এই বড় ধরনের আঘাতের পরও দমে যায়নি রাব্বি, বরং দ্বিগুণ উৎসাহে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নেয় সে। প্রাথমিক পর্যায়ে মুখে কলম কামড়ে ধরে লেখার চেষ্টা করলেও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সেই অভ্যাস বজায় রেখেছিল রাব্বি। পরবর্তীতে নিজের সুবিধার্থে পায়ের আঙুলের ফাঁকে কলম রেখে লেখার নতুন কৌশল রপ্ত করে এবং অনুশীলনের মাধ্যমে তা নিখুঁত করে তোলে।

এই দীর্ঘ পথচলায় রাব্বির পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তার পরিবারের সদস্য ছাড়াও এলাকার অনেক শিক্ষক ও গুণীজন। স্থানীয় হাজী তোবারক আলী উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর সে চট্টগ্রাম সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি হয়। এরপর সম্প্রতি প্রকাশিত উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায়ও বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন এই তরুণ। বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক ফেরদৌসী কাদরীসহ অনেক শিক্ষানুরাগী তার পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন। এ ছাড়া ওসমান নামের এক স্থানীয় শিক্ষক কোনো ধরনের পারিশ্রমিক ছাড়াই তাকে নিয়মিত পড়িয়েছেন এবং তার মনোবল ধরে রাখতে সাহায্য করেছেন। সবার সম্মিলিত সহযোগিতা ও নিজের কঠোর পরিশ্রমের ফলেই আজ এই সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন রাব্বি।

রাব্বির এই অনুপ্রেরণাদায়ক সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ সম্প্রতি তাকে বিশেষ সংবর্ধনা ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থীর উদ্যোগে গড়ে ওঠা সংগঠন এসবিএস অ্যাসোসিয়েশন তার উচ্চশিক্ষার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহনের ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছে। ওই সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাব্বি দেশের যেকোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল বা প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পেলে কোচিং থেকে শুরু করে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন পর্যন্ত সমস্ত খরচ তারা বহন করবে। ভবিষ্যতে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন রাব্বি। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা শেষ করে একটি সরকারি চাকরি নিয়ে নিজ পরিবারের অসচ্ছলতা দূর করতে চান এই অদম্য মেধাবী তরুণ।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

দুই হাত নেই, পা দিয়ে লিখে এসএসসি-এইচএসসিতে জিপিএ-৫

Update Time : ০২:৩০:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

জাতীয় ডেস্ক: শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের তরুণ মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম রাব্বি। দুর্ঘটনার কবলে পড়ে শৈশবে দুই হাত হারালেও শিক্ষার আলো থেকে দূরে সরে যাননি এই মেধাবী শিক্ষার্থী। প্রথমে মুখে এবং পরবর্তীতে পায়ের আঙুলের ফাঁকে কলম গুঁজে লেখার অভ্যাস গড়ে তোলেন তিনি। এই দীর্ঘ ও কঠিন সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়েই বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক—উভয় পরীক্ষাতেই জিপিএ-৫ অর্জনের গৌরব অর্জন করেছেন রাব্বি। তার এই অসামান্য সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও শিক্ষানুরাগীরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বড় ধরনের বিপদের মুখে পড়ে রাব্বি। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ভাটিয়ারী এলাকার একটি ফুটওভারব্রিজে চলন্ত অবস্থায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হয় সে। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসার পর তার জীবন বাঁচানো সম্ভব হলেও কনুই পর্যন্ত দুটি হাতই কেটে ফেলতে হয় চিকিৎসকদের। এই বড় ধরনের আঘাতের পরও দমে যায়নি রাব্বি, বরং দ্বিগুণ উৎসাহে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নেয় সে। প্রাথমিক পর্যায়ে মুখে কলম কামড়ে ধরে লেখার চেষ্টা করলেও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সেই অভ্যাস বজায় রেখেছিল রাব্বি। পরবর্তীতে নিজের সুবিধার্থে পায়ের আঙুলের ফাঁকে কলম রেখে লেখার নতুন কৌশল রপ্ত করে এবং অনুশীলনের মাধ্যমে তা নিখুঁত করে তোলে।

এই দীর্ঘ পথচলায় রাব্বির পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তার পরিবারের সদস্য ছাড়াও এলাকার অনেক শিক্ষক ও গুণীজন। স্থানীয় হাজী তোবারক আলী উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর সে চট্টগ্রাম সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি হয়। এরপর সম্প্রতি প্রকাশিত উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায়ও বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন এই তরুণ। বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক ফেরদৌসী কাদরীসহ অনেক শিক্ষানুরাগী তার পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন। এ ছাড়া ওসমান নামের এক স্থানীয় শিক্ষক কোনো ধরনের পারিশ্রমিক ছাড়াই তাকে নিয়মিত পড়িয়েছেন এবং তার মনোবল ধরে রাখতে সাহায্য করেছেন। সবার সম্মিলিত সহযোগিতা ও নিজের কঠোর পরিশ্রমের ফলেই আজ এই সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন রাব্বি।

রাব্বির এই অনুপ্রেরণাদায়ক সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ সম্প্রতি তাকে বিশেষ সংবর্ধনা ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থীর উদ্যোগে গড়ে ওঠা সংগঠন এসবিএস অ্যাসোসিয়েশন তার উচ্চশিক্ষার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহনের ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছে। ওই সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাব্বি দেশের যেকোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল বা প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পেলে কোচিং থেকে শুরু করে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন পর্যন্ত সমস্ত খরচ তারা বহন করবে। ভবিষ্যতে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন রাব্বি। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা শেষ করে একটি সরকারি চাকরি নিয়ে নিজ পরিবারের অসচ্ছলতা দূর করতে চান এই অদম্য মেধাবী তরুণ।