Dhaka ১১:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জীববৈচিত্র্য: প্লাস্টিক বর্জ্যে সয়লাব সুন্দরবন

Reporter Name
  • Update Time : ০৭:০০:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১৩ Time View

জাতীয় ডেস্ক: বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বর্তমানে মারাত্মক প্লাস্টিক দূষণের মুখে পড়ে চরম সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। উজানের বিভিন্ন নদী, বঙ্গোপসাগর এবং বনসংলগ্ন জনপদ থেকে ভেসে আসা পলিথিন, নাইলন জাল ও প্লাস্টিক বোতল জোয়ারের পানির সঙ্গে বনের গভীরে প্রবেশ করছে। কটকা, কচিখালী, জামতলা ও ডিমের চরের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা এবং সমুদ্রসৈকতগুলোতে হাজার হাজার টন বর্জ্য জমা হয়ে রয়েছে। এর ফলে সুন্দরবনের অত্যন্ত সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র এবং বিরল জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। অপর্যাপ্ত জনবল এবং সীমিত বাজেটের কারণে বন বিভাগ এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য অপসারণ করতে গিয়ে চরম হিমশিম খাচ্ছে।

সুন্দরবনে মূলত তিনটি প্রধান উৎস থেকে এই ক্ষতিকর প্লাস্টিক বর্জ্য প্রবেশ করছে বলে জানা গেছে। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা শহরের বর্জ্য পশুর, শিবসা, বলেশ্বর ও কপোতাক্ষসহ বিভিন্ন নদী-খাল বেয়ে প্রতিদিন জোয়ার-ভাটায় বনের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া ঢাকা ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহর এবং প্রধান নদী অববাহিকা হয়ে বিপুল বর্জ্য বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে সমুদ্রগামী জেলে ও পর্যটকদের ফেলা প্লাস্টিকসামগ্রী যুক্ত হয়ে ঢেউয়ের স্রোতে সুন্দরবনের চরে এসে জমা হচ্ছে। পাশাপাশি বনসংলগ্ন স্থানীয় বাজার, মৎস্য আড়ত এবং বসতবাড়ির বর্জ্যও নদীপথে সরাসরি বনের ভেতর প্রবেশ করছে।

সুন্দরবনে প্রতিবছর ঠিক কী পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়, তার সুনির্দিষ্ট কোনো সরকারি পরিসংখ্যান বা পূর্ণাঙ্গ গবেষণা এখনও নেই। তবে ২০১৭ সালে একটি আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকা থেকে বছরে প্রায় ৭৩ হাজার টন মাইক্রোপ্লাস্টিক বঙ্গোপসাগরে পৌঁছানোর তথ্য জানানো হয়েছিল। পরবর্তীতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২২ সালের এক গবেষণায় সুন্দরবনের পানি ও মাটিতে আশঙ্কাজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার উপস্থিতি ধরা পড়ে। পরিবেশবিদ ও গবেষকদের মতে, এই দূষণ গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, বীজের অঙ্কুরোদ্গমন এবং জলজ প্রাণীদের প্রজনন প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বনের ভেতরে প্লাস্টিক নেওয়া বা ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং বনপ্রহরীরা নিয়মিত টহল দিয়ে থাকেন। তবে নদী ও সমুদ্রের দিক থেকে ভেসে আসা বর্জ্য পুরোপুরি রোধ করা অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মনে করেন, উজানের নদী ও সাগর থেকে প্লাস্টিক আসার পথ বন্ধ করা গেলে দূষণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনা সম্ভব। সুন্দরবন বাঁচাতে তাই বন বিভাগের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সাধারণ জনগণকে নিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

জীববৈচিত্র্য: প্লাস্টিক বর্জ্যে সয়লাব সুন্দরবন

Update Time : ০৭:০০:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

জাতীয় ডেস্ক: বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বর্তমানে মারাত্মক প্লাস্টিক দূষণের মুখে পড়ে চরম সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। উজানের বিভিন্ন নদী, বঙ্গোপসাগর এবং বনসংলগ্ন জনপদ থেকে ভেসে আসা পলিথিন, নাইলন জাল ও প্লাস্টিক বোতল জোয়ারের পানির সঙ্গে বনের গভীরে প্রবেশ করছে। কটকা, কচিখালী, জামতলা ও ডিমের চরের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা এবং সমুদ্রসৈকতগুলোতে হাজার হাজার টন বর্জ্য জমা হয়ে রয়েছে। এর ফলে সুন্দরবনের অত্যন্ত সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র এবং বিরল জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। অপর্যাপ্ত জনবল এবং সীমিত বাজেটের কারণে বন বিভাগ এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য অপসারণ করতে গিয়ে চরম হিমশিম খাচ্ছে।

সুন্দরবনে মূলত তিনটি প্রধান উৎস থেকে এই ক্ষতিকর প্লাস্টিক বর্জ্য প্রবেশ করছে বলে জানা গেছে। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা শহরের বর্জ্য পশুর, শিবসা, বলেশ্বর ও কপোতাক্ষসহ বিভিন্ন নদী-খাল বেয়ে প্রতিদিন জোয়ার-ভাটায় বনের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া ঢাকা ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহর এবং প্রধান নদী অববাহিকা হয়ে বিপুল বর্জ্য বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে সমুদ্রগামী জেলে ও পর্যটকদের ফেলা প্লাস্টিকসামগ্রী যুক্ত হয়ে ঢেউয়ের স্রোতে সুন্দরবনের চরে এসে জমা হচ্ছে। পাশাপাশি বনসংলগ্ন স্থানীয় বাজার, মৎস্য আড়ত এবং বসতবাড়ির বর্জ্যও নদীপথে সরাসরি বনের ভেতর প্রবেশ করছে।

সুন্দরবনে প্রতিবছর ঠিক কী পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়, তার সুনির্দিষ্ট কোনো সরকারি পরিসংখ্যান বা পূর্ণাঙ্গ গবেষণা এখনও নেই। তবে ২০১৭ সালে একটি আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকা থেকে বছরে প্রায় ৭৩ হাজার টন মাইক্রোপ্লাস্টিক বঙ্গোপসাগরে পৌঁছানোর তথ্য জানানো হয়েছিল। পরবর্তীতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২২ সালের এক গবেষণায় সুন্দরবনের পানি ও মাটিতে আশঙ্কাজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার উপস্থিতি ধরা পড়ে। পরিবেশবিদ ও গবেষকদের মতে, এই দূষণ গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, বীজের অঙ্কুরোদ্গমন এবং জলজ প্রাণীদের প্রজনন প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বনের ভেতরে প্লাস্টিক নেওয়া বা ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং বনপ্রহরীরা নিয়মিত টহল দিয়ে থাকেন। তবে নদী ও সমুদ্রের দিক থেকে ভেসে আসা বর্জ্য পুরোপুরি রোধ করা অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মনে করেন, উজানের নদী ও সাগর থেকে প্লাস্টিক আসার পথ বন্ধ করা গেলে দূষণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনা সম্ভব। সুন্দরবন বাঁচাতে তাই বন বিভাগের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সাধারণ জনগণকে নিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।