Dhaka ১২:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ২১ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ভূমি অফিসে দালাল সিন্ডিকেট

মামুনুর রশীদ মামুন
  • Update Time : ১১:১২:৪৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬
  • / ৪৬ Time View

ময়মনসিংহ বিশেষ প্রতিনিধি::ময়মনসিংহ সদর উপজেলার ভাবখালী ও ঘাগড়া ইউনিয়নের একমাত্র ভূমি অফিসকে ঘিরে ঘুষ বাণিজ্য, দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগ সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং অভিযোগ রয়েছে, সময় যত গড়াচ্ছে, ততই আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে দালাল চক্র। ফলে ভূমি অফিসে প্রতিদিনই বাড়ছে জনভোগান্তি, প্রতারণা এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী, সেবাগ্রহীতা এবং সচেতন মহল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাবখালী-ঘাগড়া ভূমি অফিসে নামজারি, খতিয়ান, পর্চা, জমি খারিজ, আরওআর খসড়া, মাঠ পর্চা ও অন্যান্য ভূমি-সংক্রান্ত সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে পড়তে হচ্ছে দালালদের খপ্পরে। সরকারি ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ না দিলে দিনের পর দিন ফাইল আটকে রাখা, অযথা জটিলতা তৈরি করা কিংবা আবেদন নিয়ে ঘোরানোর মতো নানা কৌশলে হয়রানি করা হচ্ছে।

অভিযোগ প্রকাশ, কিন্তু ব্যবস্থা কোথায়?

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগ প্রকাশের পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে এখনো কোনো দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। ভূমি অফিস এলাকায় দালালদের আনাগোনা যেমন ছিল, তেমনি আছে। বরং অনেকে বলছেন, “প্রতিবেদন প্রকাশের পর কয়েকদিন কিছুটা সতর্কতা দেখা গেলেও এখন আবার আগের মতোই চলছে সব।”

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভূমি অফিসের সামনে ও আশপাশে প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কয়েকজন চিহ্নিত ব্যক্তি অবস্থান করেন। তারা সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে কথা বলে নিজেদের ‘সহযোগী’ বা ‘কম্পিউটার দোকানের লোক’ হিসেবে পরিচয় দেন। পরে বিভিন্ন সেবা দ্রুত পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ না করলে ফাইল সামনে এগোয় না। অনেক ক্ষেত্রে অফিসের ভেতরে আবেদন জমা দেওয়ার পরও পরে জানানো হয়—“কাগজে সমস্যা আছে”, “আরও কিছু লাগবে”, কিংবা “সময় লাগবে”। এরপরই দালালদের মাধ্যমে সমাধানের প্রস্তাব আসে।

৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষের অভিযোগ

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জমির ধরন ও সেবার ওপর নির্ভর করে ৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হচ্ছে। নামজারি, খারিজ, পর্চা ও খতিয়ান তুলতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ কৃষক, প্রবাসীর পরিবার এবং ভূমি-সংক্রান্ত বিষয়ে অজ্ঞ মানুষজন।

একাধিক সেবাগ্রহীতা জানান, সরকারি ফি খুবই সীমিত হলেও দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েক গুণ বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। কেউ টাকা দিতে না চাইলে তার ফাইল দীর্ঘদিন পড়ে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কম্পিউটার দোকানের আড়ালে সক্রিয় সিন্ডিকেট

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভূমি অফিস সংলগ্ন কয়েকটি কম্পিউটার দোকানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই দালাল সিন্ডিকেট। দোকানগুলোর আড়ালে আবেদনপত্র পূরণ, কাগজপত্র সংগ্রহ, খসড়া তৈরি এবং ফটোকপির নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, দালালরা নিজেদের কম্পিউটার দোকানের কর্মচারী পরিচয় দিলেও তাদের সঙ্গে অফিসের ভেতরের কিছু অসাধু ব্যক্তির নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অফিসে জমা দেওয়া ফাইল ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করে পরে ওই দোকানের লোকজনের মাধ্যমে ‘সমাধান’ দেওয়া হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, অফিসের ভেতরে ও বাইরে একটি অদৃশ্য সমন্বয়ের মাধ্যমেই এই চক্র পরিচালিত হচ্ছে। ফলে প্রকৃত সেবাগ্রহীতারা বাধ্য হয়েই দালালের দ্বারস্থ হচ্ছেন।

বহিরাগত নারীকে ঘিরেও উঠেছে অর্থ আদায়ের অভিযোগ

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ত্রিশাল দরগা বাজার এলাকার তাসলিমা নামের এক বহিরাগত নারী দীর্ঘদিন ধরে এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত থেকে বিভিন্ন সেবার নামে অর্থ আদায় করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, আরওআর খসড়া বাবদ ২০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং মাঠ পর্চার ফটোকপি বাবদ ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে মূল নথি না দেখিয়ে শুধু ফটোকপি সরবরাহ করা হয়। এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমি-সংক্রান্ত কাগজপত্রের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এভাবে মূল নথির পরিবর্তে ফটোকপি দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা শুধু অনৈতিকই নয়, বরং এতে নথি বিকৃতি ও জালিয়াতির ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

চিহ্নিত কয়েকজনের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ

অনুসন্ধানকারী সূত্র ও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, এই দালাল চক্রের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের নামও সামনে এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন—রফিকুল (পিতা: রমজান আলী, গ্রাম: চুরখায়), সজিব (পিতা: খুশি, গ্রাম: চরখায়), জুম্মন (পিতা: মোতালেব, মৌজা: মদল), রিদয় (গ্রাম: চুরখায়), আব্দুল্লাহ (গ্রাম: নেহালিয়াকান্দা) এবং খালেক (পিতা: মৃত আতা, গ্রাম: পন-ঘাগড়া)।

স্থানীয়দের দাবি, এরা প্রতিদিন অফিসের আশপাশে অবস্থান করে সেবাগ্রহীতাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। কেউ সরাসরি অফিসে গিয়ে কাজ করতে চাইলে তাকে নানা ধরনের ভয়ভীতি, বিভ্রান্তি কিংবা “সময় লাগবে” ধরনের কথা বলে দালালের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়।

তবে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কেউ বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

নায়েবের অস্বীকৃতি, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

এই অভিযোগের বিষয়ে ভাবখালী-ঘাগড়া ভূমি অফিসের নায়েব লুৎফর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আমি বরং দালাল চক্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। এ কারণেই আমাকে জড়িয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হচ্ছে। দালালদের আনাগোনা বন্ধ করতে অফিসের পেছনের রাস্তা টিন দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে।”

তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, টিনের গেট থাকলেও অফিস এলাকায় দালালদের উপস্থিতি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং স্থানীয়দের অভিযোগ, আগের মতোই অফিসের আশপাশে তাদের তৎপরতা রয়েছে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—যদি দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে এখনো কীভাবে প্রকাশ্যে তারা অফিস এলাকায় অবস্থান করছে? প্রশাসনের চোখের সামনে এমন একটি চক্র কীভাবে দিনের পর দিন সক্রিয় থাকে—সেই প্রশ্নও তুলছেন স্থানীয়রা।

তদন্তের আশ্বাস, বাস্তবায়নের অপেক্ষা

অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল ফেরদৌস হ্যাপি পূর্বে জানিয়েছিলেন, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে এবং তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কিন্তু অভিযোগ প্রকাশের পরও এখনো পর্যন্ত কোনো অভিযান, প্রশাসনিক ব্যবস্থা কিংবা দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত হওয়ার মতো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি বলে দাবি এলাকাবাসীর। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কেবল আশ্বাস দিয়ে এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব নয়। মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি, দালালদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, অফিসে সিসিটিভি স্থাপন, সেবার তালিকা ও সরকারি ফি প্রকাশ্যে টানিয়ে দেওয়া এবং অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা চালু না করলে এই দুর্নীতির চক্র ভাঙা সম্ভব হবে না।

স্বচ্ছতা না এলে কমবে না জনভোগান্তি

ভূমি অফিসকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সরকারি সেবা পেতে গিয়ে হয়রানি, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং প্রতারণার শিকার হয়ে অনেকেই নীরবে ফিরে যাচ্ছেন। কেউ কেউ জমি-সংক্রান্ত কাজের জন্য ধার-দেনা করে টাকা জোগাড় করতেও বাধ্য হচ্ছেন।

স্থানীয় নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দের দাবি, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্ত করে প্রয়োজন হলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

তাদের ভাষায়, “স্মার্ট বাংলাদেশের কথা বলা হলেও, মাঠপর্যায়ে যদি সাধারণ মানুষ ঘুষ ছাড়া ভূমি অফিসে সেবা না পায়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবেই।”

ভাবখালী-ঘাগড়া ভূমি অফিসে দালাল সিন্ডিকেট ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ নিয়ে প্রশাসন শেষ পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নেয়—এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে স্থানীয় জনসাধারণ, সচেতন মহল এবং ভুক্তভোগী সেবাগ্রহীতারা।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

ভূমি অফিসে দালাল সিন্ডিকেট

Update Time : ১১:১২:৪৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬

ময়মনসিংহ বিশেষ প্রতিনিধি::ময়মনসিংহ সদর উপজেলার ভাবখালী ও ঘাগড়া ইউনিয়নের একমাত্র ভূমি অফিসকে ঘিরে ঘুষ বাণিজ্য, দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগ সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং অভিযোগ রয়েছে, সময় যত গড়াচ্ছে, ততই আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে দালাল চক্র। ফলে ভূমি অফিসে প্রতিদিনই বাড়ছে জনভোগান্তি, প্রতারণা এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী, সেবাগ্রহীতা এবং সচেতন মহল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাবখালী-ঘাগড়া ভূমি অফিসে নামজারি, খতিয়ান, পর্চা, জমি খারিজ, আরওআর খসড়া, মাঠ পর্চা ও অন্যান্য ভূমি-সংক্রান্ত সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে পড়তে হচ্ছে দালালদের খপ্পরে। সরকারি ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ না দিলে দিনের পর দিন ফাইল আটকে রাখা, অযথা জটিলতা তৈরি করা কিংবা আবেদন নিয়ে ঘোরানোর মতো নানা কৌশলে হয়রানি করা হচ্ছে।

অভিযোগ প্রকাশ, কিন্তু ব্যবস্থা কোথায়?

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগ প্রকাশের পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে এখনো কোনো দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। ভূমি অফিস এলাকায় দালালদের আনাগোনা যেমন ছিল, তেমনি আছে। বরং অনেকে বলছেন, “প্রতিবেদন প্রকাশের পর কয়েকদিন কিছুটা সতর্কতা দেখা গেলেও এখন আবার আগের মতোই চলছে সব।”

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভূমি অফিসের সামনে ও আশপাশে প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কয়েকজন চিহ্নিত ব্যক্তি অবস্থান করেন। তারা সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে কথা বলে নিজেদের ‘সহযোগী’ বা ‘কম্পিউটার দোকানের লোক’ হিসেবে পরিচয় দেন। পরে বিভিন্ন সেবা দ্রুত পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ না করলে ফাইল সামনে এগোয় না। অনেক ক্ষেত্রে অফিসের ভেতরে আবেদন জমা দেওয়ার পরও পরে জানানো হয়—“কাগজে সমস্যা আছে”, “আরও কিছু লাগবে”, কিংবা “সময় লাগবে”। এরপরই দালালদের মাধ্যমে সমাধানের প্রস্তাব আসে।

৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষের অভিযোগ

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জমির ধরন ও সেবার ওপর নির্ভর করে ৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হচ্ছে। নামজারি, খারিজ, পর্চা ও খতিয়ান তুলতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ কৃষক, প্রবাসীর পরিবার এবং ভূমি-সংক্রান্ত বিষয়ে অজ্ঞ মানুষজন।

একাধিক সেবাগ্রহীতা জানান, সরকারি ফি খুবই সীমিত হলেও দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েক গুণ বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। কেউ টাকা দিতে না চাইলে তার ফাইল দীর্ঘদিন পড়ে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কম্পিউটার দোকানের আড়ালে সক্রিয় সিন্ডিকেট

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভূমি অফিস সংলগ্ন কয়েকটি কম্পিউটার দোকানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই দালাল সিন্ডিকেট। দোকানগুলোর আড়ালে আবেদনপত্র পূরণ, কাগজপত্র সংগ্রহ, খসড়া তৈরি এবং ফটোকপির নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, দালালরা নিজেদের কম্পিউটার দোকানের কর্মচারী পরিচয় দিলেও তাদের সঙ্গে অফিসের ভেতরের কিছু অসাধু ব্যক্তির নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অফিসে জমা দেওয়া ফাইল ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করে পরে ওই দোকানের লোকজনের মাধ্যমে ‘সমাধান’ দেওয়া হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, অফিসের ভেতরে ও বাইরে একটি অদৃশ্য সমন্বয়ের মাধ্যমেই এই চক্র পরিচালিত হচ্ছে। ফলে প্রকৃত সেবাগ্রহীতারা বাধ্য হয়েই দালালের দ্বারস্থ হচ্ছেন।

বহিরাগত নারীকে ঘিরেও উঠেছে অর্থ আদায়ের অভিযোগ

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ত্রিশাল দরগা বাজার এলাকার তাসলিমা নামের এক বহিরাগত নারী দীর্ঘদিন ধরে এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত থেকে বিভিন্ন সেবার নামে অর্থ আদায় করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, আরওআর খসড়া বাবদ ২০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং মাঠ পর্চার ফটোকপি বাবদ ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে মূল নথি না দেখিয়ে শুধু ফটোকপি সরবরাহ করা হয়। এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমি-সংক্রান্ত কাগজপত্রের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এভাবে মূল নথির পরিবর্তে ফটোকপি দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা শুধু অনৈতিকই নয়, বরং এতে নথি বিকৃতি ও জালিয়াতির ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

চিহ্নিত কয়েকজনের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ

অনুসন্ধানকারী সূত্র ও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, এই দালাল চক্রের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের নামও সামনে এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন—রফিকুল (পিতা: রমজান আলী, গ্রাম: চুরখায়), সজিব (পিতা: খুশি, গ্রাম: চরখায়), জুম্মন (পিতা: মোতালেব, মৌজা: মদল), রিদয় (গ্রাম: চুরখায়), আব্দুল্লাহ (গ্রাম: নেহালিয়াকান্দা) এবং খালেক (পিতা: মৃত আতা, গ্রাম: পন-ঘাগড়া)।

স্থানীয়দের দাবি, এরা প্রতিদিন অফিসের আশপাশে অবস্থান করে সেবাগ্রহীতাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। কেউ সরাসরি অফিসে গিয়ে কাজ করতে চাইলে তাকে নানা ধরনের ভয়ভীতি, বিভ্রান্তি কিংবা “সময় লাগবে” ধরনের কথা বলে দালালের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়।

তবে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কেউ বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

নায়েবের অস্বীকৃতি, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

এই অভিযোগের বিষয়ে ভাবখালী-ঘাগড়া ভূমি অফিসের নায়েব লুৎফর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আমি বরং দালাল চক্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। এ কারণেই আমাকে জড়িয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হচ্ছে। দালালদের আনাগোনা বন্ধ করতে অফিসের পেছনের রাস্তা টিন দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে।”

তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, টিনের গেট থাকলেও অফিস এলাকায় দালালদের উপস্থিতি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং স্থানীয়দের অভিযোগ, আগের মতোই অফিসের আশপাশে তাদের তৎপরতা রয়েছে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—যদি দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে এখনো কীভাবে প্রকাশ্যে তারা অফিস এলাকায় অবস্থান করছে? প্রশাসনের চোখের সামনে এমন একটি চক্র কীভাবে দিনের পর দিন সক্রিয় থাকে—সেই প্রশ্নও তুলছেন স্থানীয়রা।

তদন্তের আশ্বাস, বাস্তবায়নের অপেক্ষা

অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল ফেরদৌস হ্যাপি পূর্বে জানিয়েছিলেন, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে এবং তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কিন্তু অভিযোগ প্রকাশের পরও এখনো পর্যন্ত কোনো অভিযান, প্রশাসনিক ব্যবস্থা কিংবা দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত হওয়ার মতো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি বলে দাবি এলাকাবাসীর। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কেবল আশ্বাস দিয়ে এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব নয়। মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি, দালালদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, অফিসে সিসিটিভি স্থাপন, সেবার তালিকা ও সরকারি ফি প্রকাশ্যে টানিয়ে দেওয়া এবং অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা চালু না করলে এই দুর্নীতির চক্র ভাঙা সম্ভব হবে না।

স্বচ্ছতা না এলে কমবে না জনভোগান্তি

ভূমি অফিসকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সরকারি সেবা পেতে গিয়ে হয়রানি, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং প্রতারণার শিকার হয়ে অনেকেই নীরবে ফিরে যাচ্ছেন। কেউ কেউ জমি-সংক্রান্ত কাজের জন্য ধার-দেনা করে টাকা জোগাড় করতেও বাধ্য হচ্ছেন।

স্থানীয় নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দের দাবি, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্ত করে প্রয়োজন হলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

তাদের ভাষায়, “স্মার্ট বাংলাদেশের কথা বলা হলেও, মাঠপর্যায়ে যদি সাধারণ মানুষ ঘুষ ছাড়া ভূমি অফিসে সেবা না পায়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবেই।”

ভাবখালী-ঘাগড়া ভূমি অফিসে দালাল সিন্ডিকেট ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ নিয়ে প্রশাসন শেষ পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নেয়—এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে স্থানীয় জনসাধারণ, সচেতন মহল এবং ভুক্তভোগী সেবাগ্রহীতারা।