Dhaka ১০:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬, ২২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দেড় মাসেই পাহাড় ছিল, এখন কেটে সমতল ভূমি

স ম জিয়াউর রহমান
  • Update Time : ০৩:৩১:১০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬
  • / ১৫ Time View

চট্টগ্রাম ::পাহাড় কেটে সমতল করে ফেলা হয়েছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের জালিয়ারচাং এলাকা থেকে দেখা যায় এ নারকীয় দৃশ্য।

দেড় মাস আগেও ছিল এটা আস্ত পাহাড়। বড় বড় গাছের সারি। ঘন জঙ্গল। আশপাশে এত বড় ও উঁচু পাহাড় আর না থাকায় পাহাড়টি স্থানীয় লোকজনের কাছে ‘আসমানের খুঁটি’ নামেও পরিচিত ছিল। মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে পাহাড়টির এক-তৃতীয়াংশ যেন নাই হয়ে গেছে। রাতে-দিনে দুটি এক্সক্যাভেটর (খননযন্ত্র) দিয়ে আড়াই একরের পাহাড়টি কেটে সমতল ভূমি বানিয়ে ফেলা হয়েছে।

এটি কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের জালিয়ারচাং এলাকার একটি পাহাড়ের চিত্র। বিশালাকৃতির এই পাহাড় স্থানীয় চারজনের একটি চক্র কেটে সাবাড় করে ফেলেছেন বলে অনুসন্ধানে জানা যায়।

আনোয়ারা-বাঁশখালী-চকরিয়া (এবিসি) আঞ্চলিক মহাসড়কের পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের পুরোনো ইউপি কার্যালয় থেকে পূর্ব দিকে ৮০০ মিটার গেলেই জালিয়ারচাং জামে মসজিদ। মসজিদ থেকে হাতের বামে দেড় শ মিটার গেলে চোখে পড়ে পাহাড় কাটার করুন দৃশ্য।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. খালেকুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘পাহাড়টি সংরক্ষিত বনের নয়। এটি সংরক্ষিত বন থেকে ২৯০ মিটার দূরে। এ ক্ষেত্রে চোখের সামনে পাহাড় কাটা পড়লেও আমাদের করার কিছু থাকে না। এটি ব্যক্তি মালিকানাধীন। এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থার সুযোগ আছে পরিবেশ অধিদপ্তর বা উপজেলা প্রশাসনের।’

সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, পাহাড় কেটে তৈরি করা সমতল জায়গাটি বিশালাকৃতির মাঠের সমান। দুই পাশে পাহাড়ের কাটা অংশে খননযন্ত্রের ক্ষত। পাহাড় থেকে উপড়ে ফেলা বড় বড় গাছের শেকড় বেরিয়ে আছে কাটা অংশ দিয়ে। কিছু পড়ে আছে মাটিতে।
পাহাড়ের পাদদেশের দুই অংশে দুটি ঘর। মাঝখানে পাহাড় কেটে সমতল করে মহাসড়কের মতো রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। একটি ঘরের মালিক মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, ‘প্রবাসী আমান উল্লাহ পাহাড়টির মালিক। তিনি পাহাড়টির মাটি কয়েকজন স্থানীয় প্রভাবশালীকে বিক্রি করে দিয়েছেন।’

মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, ‘এই পাহাড় বহু বছরের পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী। স্থানীয়ভাবে এটি আসমানের খুঁটি হিসেবে বহুল আলোচিত ও পরিচিত। পাহাড়টি কেটে ফেলায় বলতে গেলে পুরো এলাকা চরম ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড় কাটা যখন শুরু হয়, তখন কয়েক দিন প্রতিবাদ করেছিলাম। তাঁরা বাধা মানেননি, একপর্যায়ে আমাদের প্রাণনাশেরও হুমকি দেওয়া হয়। এরপর চুপ হয়ে যাই।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমানউল্লাহ স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালীর কাছে পাহাড়ের মাটি বিক্রি করেছেন। তাঁরাই রাত-দিন খননযন্ত্র দিয়ে কেটে পাহাড়টি সাবাড় করেছেন। এদের মধ্যে আবু তাহের নামের একজন পাহাড় কাটার কথা স্বীকার করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আবু তাহের ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক দলের প্রভাব কাটিয়ে পাহাড় কাটিয়ে সাবাড় করছে, তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে পারছে না। কেউ প্রতিবাদ করলে মামলা ও হামলার ভয় দেখান।

পাহাড় কাটার অভিযোগ সম্পর্কে আবু তাহের বলেন, পাহাড়টি ব্যক্তি মালিকানাধীন। বন বিভাগেরও নয়। ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড় বলেই কাটা হয়েছে। পাহাড় না কাটতে আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে তিনি জানেন না বলে জানান। তবে আমান উল্লাহ প্রবাসে থাকায় তাঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়নি।

ব্যক্তি মালিকানাধীন হলেও পাহাড় বা টিলা কাটা আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি বা ছাড়পত্র ছাড়া সরকারি, আধা সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড় কাটা বা মোচন করা দণ্ডনীয় অপরাধ। আইন অমান্য করলে ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা জরিমানা, এমনকি উভয় দণ্ড হতে পারে।

জানতে চাইলে পেকুয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ এস এম নুরুল আখতার নিলয় বলেন, ‘জালিয়ারচাংয়ের পাহাড় কাটার বিষয়টি আমরা জেনেছি। পাহাড়টি বন বিভাগেরও নয়। ব্যক্তি মালিকানাধীন হলেও অনুমতিবিহীন পাহাড় কাটার সুযোগ নেই। আমরা এই পাহাড় কাটার বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেব।’

কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জমির উদ্দিন বলেন, ‘পেকুয়ায় পাহাড় কাটার বিষয়টি আমাদের জানা নেই। তবে সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন কোনো পাহাড়ই কাটার সুযোগ নেই। আমি এখনই খোঁজ নিচ্ছি। দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে’।

এদিকে বৃহত্তর চট্টগ্রামের পরিবেশ, জলবায়ু, কৃষি, স্ব্যস্হ্য ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গ্রীন চট্টগ্রাম এ্যালায়েন্সের নেতৃবৃন্দ গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও সদস্য সচিব স ম জিয়াউর রহমান, সদস্য মোহাম্মদ এমরান ও নজীব চৌধুরী এক বিবৃতিতে বলেন, কক্সবাজার জেলার পেকুয়া এলাকার টইটং এ হাজার বছরের ঐতিহাসিক পাহাড় কেটে সাবাড় করছে কতিপয় পাহাড় খেকো চক্র, আর নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ, জেলা প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। এটা চরম লজ্জা ও দুঃখজনক। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এটা বন্ধ ও পাহাড় খেকোদের আইনের আওতায় এনে কঠিন শাস্তির দাবি জানান।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

দেড় মাসেই পাহাড় ছিল, এখন কেটে সমতল ভূমি

Update Time : ০৩:৩১:১০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬

চট্টগ্রাম ::পাহাড় কেটে সমতল করে ফেলা হয়েছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের জালিয়ারচাং এলাকা থেকে দেখা যায় এ নারকীয় দৃশ্য।

দেড় মাস আগেও ছিল এটা আস্ত পাহাড়। বড় বড় গাছের সারি। ঘন জঙ্গল। আশপাশে এত বড় ও উঁচু পাহাড় আর না থাকায় পাহাড়টি স্থানীয় লোকজনের কাছে ‘আসমানের খুঁটি’ নামেও পরিচিত ছিল। মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে পাহাড়টির এক-তৃতীয়াংশ যেন নাই হয়ে গেছে। রাতে-দিনে দুটি এক্সক্যাভেটর (খননযন্ত্র) দিয়ে আড়াই একরের পাহাড়টি কেটে সমতল ভূমি বানিয়ে ফেলা হয়েছে।

এটি কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের জালিয়ারচাং এলাকার একটি পাহাড়ের চিত্র। বিশালাকৃতির এই পাহাড় স্থানীয় চারজনের একটি চক্র কেটে সাবাড় করে ফেলেছেন বলে অনুসন্ধানে জানা যায়।

আনোয়ারা-বাঁশখালী-চকরিয়া (এবিসি) আঞ্চলিক মহাসড়কের পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের পুরোনো ইউপি কার্যালয় থেকে পূর্ব দিকে ৮০০ মিটার গেলেই জালিয়ারচাং জামে মসজিদ। মসজিদ থেকে হাতের বামে দেড় শ মিটার গেলে চোখে পড়ে পাহাড় কাটার করুন দৃশ্য।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. খালেকুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘পাহাড়টি সংরক্ষিত বনের নয়। এটি সংরক্ষিত বন থেকে ২৯০ মিটার দূরে। এ ক্ষেত্রে চোখের সামনে পাহাড় কাটা পড়লেও আমাদের করার কিছু থাকে না। এটি ব্যক্তি মালিকানাধীন। এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থার সুযোগ আছে পরিবেশ অধিদপ্তর বা উপজেলা প্রশাসনের।’

সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, পাহাড় কেটে তৈরি করা সমতল জায়গাটি বিশালাকৃতির মাঠের সমান। দুই পাশে পাহাড়ের কাটা অংশে খননযন্ত্রের ক্ষত। পাহাড় থেকে উপড়ে ফেলা বড় বড় গাছের শেকড় বেরিয়ে আছে কাটা অংশ দিয়ে। কিছু পড়ে আছে মাটিতে।
পাহাড়ের পাদদেশের দুই অংশে দুটি ঘর। মাঝখানে পাহাড় কেটে সমতল করে মহাসড়কের মতো রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। একটি ঘরের মালিক মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, ‘প্রবাসী আমান উল্লাহ পাহাড়টির মালিক। তিনি পাহাড়টির মাটি কয়েকজন স্থানীয় প্রভাবশালীকে বিক্রি করে দিয়েছেন।’

মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, ‘এই পাহাড় বহু বছরের পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী। স্থানীয়ভাবে এটি আসমানের খুঁটি হিসেবে বহুল আলোচিত ও পরিচিত। পাহাড়টি কেটে ফেলায় বলতে গেলে পুরো এলাকা চরম ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড় কাটা যখন শুরু হয়, তখন কয়েক দিন প্রতিবাদ করেছিলাম। তাঁরা বাধা মানেননি, একপর্যায়ে আমাদের প্রাণনাশেরও হুমকি দেওয়া হয়। এরপর চুপ হয়ে যাই।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমানউল্লাহ স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালীর কাছে পাহাড়ের মাটি বিক্রি করেছেন। তাঁরাই রাত-দিন খননযন্ত্র দিয়ে কেটে পাহাড়টি সাবাড় করেছেন। এদের মধ্যে আবু তাহের নামের একজন পাহাড় কাটার কথা স্বীকার করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আবু তাহের ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক দলের প্রভাব কাটিয়ে পাহাড় কাটিয়ে সাবাড় করছে, তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে পারছে না। কেউ প্রতিবাদ করলে মামলা ও হামলার ভয় দেখান।

পাহাড় কাটার অভিযোগ সম্পর্কে আবু তাহের বলেন, পাহাড়টি ব্যক্তি মালিকানাধীন। বন বিভাগেরও নয়। ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড় বলেই কাটা হয়েছে। পাহাড় না কাটতে আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে তিনি জানেন না বলে জানান। তবে আমান উল্লাহ প্রবাসে থাকায় তাঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়নি।

ব্যক্তি মালিকানাধীন হলেও পাহাড় বা টিলা কাটা আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি বা ছাড়পত্র ছাড়া সরকারি, আধা সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড় কাটা বা মোচন করা দণ্ডনীয় অপরাধ। আইন অমান্য করলে ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা জরিমানা, এমনকি উভয় দণ্ড হতে পারে।

জানতে চাইলে পেকুয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ এস এম নুরুল আখতার নিলয় বলেন, ‘জালিয়ারচাংয়ের পাহাড় কাটার বিষয়টি আমরা জেনেছি। পাহাড়টি বন বিভাগেরও নয়। ব্যক্তি মালিকানাধীন হলেও অনুমতিবিহীন পাহাড় কাটার সুযোগ নেই। আমরা এই পাহাড় কাটার বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেব।’

কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জমির উদ্দিন বলেন, ‘পেকুয়ায় পাহাড় কাটার বিষয়টি আমাদের জানা নেই। তবে সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন কোনো পাহাড়ই কাটার সুযোগ নেই। আমি এখনই খোঁজ নিচ্ছি। দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে’।

এদিকে বৃহত্তর চট্টগ্রামের পরিবেশ, জলবায়ু, কৃষি, স্ব্যস্হ্য ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গ্রীন চট্টগ্রাম এ্যালায়েন্সের নেতৃবৃন্দ গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও সদস্য সচিব স ম জিয়াউর রহমান, সদস্য মোহাম্মদ এমরান ও নজীব চৌধুরী এক বিবৃতিতে বলেন, কক্সবাজার জেলার পেকুয়া এলাকার টইটং এ হাজার বছরের ঐতিহাসিক পাহাড় কেটে সাবাড় করছে কতিপয় পাহাড় খেকো চক্র, আর নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ, জেলা প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। এটা চরম লজ্জা ও দুঃখজনক। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এটা বন্ধ ও পাহাড় খেকোদের আইনের আওতায় এনে কঠিন শাস্তির দাবি জানান।